ই-কমার্স বিজনেস শুরুর A to Z গাইডলাইন

ই-কমার্স বিজনেস শুরুর A to Z গাইডলাইন

ই-কমার্স বিজনেসঃ

টাইটেল দেখেই ভাবলেন ব্যবসা শুরু করবেন, তাহলে এই পোস্ট আপনার জন্য না। শুধু শুধু সময় নষ্ট কেন করবেন? শর্টকাট খোজেন? ধৈর্য্য নাই আপনার? রিস্ক নিতে ভয় পান? রিসার্চ করতে মন চায় না? কাজের প্রেসার নিতে পারেন না? মানুষের গালি সহ্য করতে পারেন না? তাহলে ব্যবসা আপনার জন্য না, অন্যকিছু তে মন দেন ভাল কিছু করবেন। কিন্তু শখের বশে ব্যবসা শুরু করবেন না দয়া করে। ই-কমার্স বিজনেস শুরু করতে হলে আপনাকে আগে এর আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত জানতে হবে।

এত ডিমোটিভেট করার পরও আপনি এই লেখা পড়তেছেন? হ্যা আপনাকে দিয়েই হবে। আপনি প্রথম ধাপে পাশ করেছেন। কিন্তু এত খুশি হওয়ার কিছু নাই, আপনি এখনো দূর থেকে সমুদ্র দেখতেছেন, এর গভীরতা সম্পর্কে ধারনাও নাই আপনার। ব্যবসার ব্যাপারে এলন মাস্কের কথাটা মনে আছে? Starting a company is like eating glass and staring into the abyss” – Elon Musk. আসলেই তাই। এটা স্ব-ইচ্ছায় কাচ খাওয়ার মতই কঠিন ব্যাপার। তাই বলে অসম্ভব কিছু না। পরিশ্রম করলে যে কোন কিছুই সম্ভব করা যায়।

ব্যবসা করা অনেক কঠিন, কিন্তু এর শুরুটা আরো শতগুন কঠিন। কিন্তু টেকনোলজির উন্নতির জন্য এটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। প্রচলিত ব্যবসা এখন রুপ নিয়েছে ই-কমার্সে। যেটা ক্রেতা-বিক্রেতা দুজনের জন্যই অনেক উপকারী হয়ে গেছে। ই-কমার্স মানে হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক কমার্স। প্রচলিত লোকাল ব্যবসা অনলাইনের করার নামই হচ্ছে ই-কমার্স। ই-কমার্সের সব থেকে বড় দিকটা হল, আপনি এক জায়গা থেকে সারা বিশ্বে আপনার ব্যবসাকে প্রসারিত করতে পারবেন। আর এর জন্য কাস্টমারকে আপনার কাছে আসতে হবে না বা আপনাকে কাস্টমারের কাছে যেতে হবে না। অনেকে এটা শুরু করতে চায়, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে আর কিভাবে সব করবে এর সঠিক গাইডলাইনের অভাবে শুরু করতে পারে না। আর সে জন্যই এই লেখা। আশা করি আপনার ই-কমার্স শুরু করতে আর কোন বাধা থাকবে না।

আর যদি জানতে চান আপনার ব্যবসার জন্য ই-কমার্স কেন এত জরুরী তাহলে আমাদের লিংক করা পোষ্টটি আপনাকে সহযোগীতা করবে ই-কমার্স সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পেতে। ফেসবুক পেজ বিজনেসকে কেন ইভ্যালি, দারাজের মত ই-কর্মাসে রূপ দিবেন? 

মানসিক প্রস্তুতিঃ

ব্যবসা বা অন্য কিছু যাই করতে যান সবার আগে মানসিক ভাবে তৈরি থাকাটা বেশি দরকার। সব কিছুর প্রতি পদক্ষেপেই হাজারও বাধা -বিপত্তি আসবে এসবের সাথে মোকাবেলা করার জন্য আপনাকে তৈরি থাকতে হবে। নতুন কোন ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে এটা আরো কঠিন। তাই আপনার মন কে বার বার জিজ্ঞেস করুন, আপনি সত্যিই এতকিছুর জন্য প্রস্তুত তো? আবার ভাবুন আবার ভাবুন।

নামকরনঃ 

আপনার ই-কমার্সের নামকরন অনেক গুরুত্বপূর্ন একটা ব্যাপার। নাম হতে হবে সুন্দর, সহজ, ইউনিক যাতে মানুষ খুব সহজে মনে রাখতে পারে। নাম ঠিক করার সময় ডোমেইন ফাকা আছে কি না এটা অবশ্যই দেখতে হবে, ফাকা না থাকলে ওই নাম বাদ দিয়ে ইউনিক নাম খুজতে হবে। ডোমেইনের নাম কেন জরুরি সেটা পরে বলতেছি। তবে নামটা আপনার প্রোডাক্ট এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে করতে হবে, যত ছোট করা যায় তত ভাল, এতে করে পরে এসইও তে কাজে লাগবে। 

আইনি কার্যাবলীঃ

ট্রেড-লাইসেন্স, ব্যবসায়ীক বৈধতা সার্টিফিকেট। এটা খুব গুরুত্বপূর্ন একটা জিনিস। অনেক কাজের জন্য আপনার এটা লাগবেই। যেমনঃ অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম নিতে গেলে এটা লাগবে। এটা ছাড়াও আরো অনেক কাজে আপনার ব্যবসার সরকারী বৈধতা প্রমান দেওয়ার জন্য লাগবে। 

প্রোডাক্ট সিলেক্টঃ

আপনার ই-কমার্সের সফলতা অনেকাংশে সঠিক প্রোডাক্ট নির্ধারনের উপর নির্ভরশীল। তাই কাস্টমারের চাহিদা আর প্রোডাক্টের সহজলভ্যতার কথা চিন্তা করে প্রোডাক্ট সিলেক্ট করুন। অলরেডি অনেক পপুলার ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আছেই। মানে প্রতিযোগিতা অনেক কঠিন হবে। তাই আপনাকে এমন কিছু দিয়ে শুরু করতে হবে যেন কাস্টমার আপনার প্রোডাক্ট কিনতে আগ্রহী হয়। প্রোডাক্টের অনেক ক্যাটেগরি আছে সেখান থেকে ১টা সিলেক্ট করুন, কয়েকটা ক্যাটেগরি একসাথে মিক্স করতে যাবেন না, তাহলে প্রথমেই কাস্টমারের বিশ্বাস হারাবেন। কারন জগাখিচুড়ী হলে কাস্টমার ভাববে আপনার স্পেশাল বলে কিছুই নাই। তাই ভালভাবে রিসার্চ করুন কোন প্রোডাক্টের চাহিদা অনেক কিন্তু সাপ্লায়ার অনেক কম। যেটা আপনাকে সবার থেকে এগিয়ে রাখবে।

ই-কমার্স পোডাক্ট সোর্স

প্রোডাক্ট সোর্সঃ

আপনি কোন ধরনের প্রোডাক্ট সিলেক্ট করছেন সেটার উপর বেজ করে এবার প্রোডাক্ট সোর্স খুজতে হবে। এর জন্য আপনাকে সব থেকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে প্রোডাক্ট এর দামের উপর। কারন, যত কম খরচে প্রোডাক্ট সংগ্রহ করতে পারবেন, তত কম খরচে আপনিও সেল করতে পারবেন। এত এত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সাথে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে হলে এটার উপরেই বেশি নজর দিতে হবে।

 

ডেলিভারীঃ

কাস্টমারের মন জয় করার অন্যতম মাধ্যম হল প্রোডাক্ট ডেলিভারী। কাস্টমার যেন খুব দ্রুত, অক্ষত, সুন্দর প্যাকেজিং করা প্রোডাক্ট হাতে পায় এটার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা আপনাকেই করতে হবে। এটাতে যদি ব্যর্থ হন, তাহলে রিটার্ন কাস্টমার কখনোই পাবেন না, সেই সাথে নতুন কাস্টমারের সংখ্যাও দিন দিন কমতেই থাকবে। এটার ক্ষেত্রেও আপনাকে দেখতে হবে, যেন সর্বনিম্ন খরচে সব থেকে ভাল সার্ভিস দেওয়া যায়। এর জন্য আপনি ই-কুরিয়ারের সাহায্য নিতে পারেন। এখন এমন অনেক কুরিয়ার আছে যারা প্রোডাক্ট ডেলিভারী সার্ভিস দেয়। এটার অনেক ভাল একটা সুবিধা আছে, সেটা হল অর্ডার ট্র্যাকিং। এতে কাস্টমার প্রোডাক্টের রিয়েলটাইম অবস্থান জানতে পারবে, আর নিশ্চিত থাকতে পারবে। কিন্তু, এই ই-কুরিয়ার সিলেক্ট করতে হবে ভালভাবে দেখেশুনে। কারন ই-কুরিয়ার যদি সময়মত আর অক্ষত প্রোডাক্ট ডেলিভারী করতে না পারে, এর সম্পুর্ন ইফেক্ট পড়বে আপনার উপর। তাই যারা ভাল সার্ভিস দেয় তাদের থেকে সার্ভিস নিতে হবে।

পেমেন্ট সিস্টেমঃ

আপনার প্রোডাক্ট কেনার পর কাস্টমার পেমেন্ট করবে কোন মাধ্যমে সেটা ঠিক করতে হবে। অনেক অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম আছে, যেমনঃ বিকাশ, রকেট, ব্যাংক সহ আরো অনেক মাধ্যম। এগুলার মধ্যে আপনাকে এমন একটা সিলেক্ট করতে হবে যেন কাস্টমার খুব সহজে এবং নিরাপদে পেমেন্ট করতে পারে। 

মার্কেটিংঃ

সব কিছুর পর এবার মার্কেটিং এর পালা। কাস্টমার যদি আপনার ব্যবসার কথা জানতেই না পারে, তাহলে ব্যবসা হবে কিভাবে। তার জন্য করতে হবে মার্কেটিং। বলা হয় ‘প্রচারেই প্রসার’। ব্যবসা টিকিয়ে রাখার অন্যতম মাধ্যমই হচ্ছে মার্কেটিং। যত ভাল মার্কেটিং করতে পারবেন আপনার ব্যবসার প্রসার তত বেশি হবে। আর এই মার্কেটিং আপনাকে করতে হবে সবসময়। সে জন্য আপনার মোট বাজেটের ৩৫% – ৪৫% সমপরিমান বাজেট রাখতে হবে শুধুমাত্র মার্কেটিং এর জন্য। মার্কেটিং করতে হবে দুইভাবে। ১. অনলাইন, ২. অফলাইন। দুই ধরনের মার্কেটিং করতে হবে। যেহেতু ই-কমার্স তাই অনলাইন মার্কেটিং এর উপর জোর দিতে বেশি। তাই বলে অফলাইন মার্কেটিংকে বাদ দিবেন তা কিন্তু না। অফলাইন মার্কেটিংও করতে হবে। এখানে অফলাইন মার্কেটিং নিয়ে কোন আলোচনা আমরা করব না। শুধু অনলাইন মার্কেটিং নিয়েই কথা হবে।

অনলাইন মার্কেটিংঃ

অনলাইন মার্কেটিং বলতে সোস্যাল মিডিয়া আর ওয়েব সাইট গুগল র‍্যাঙ্ক। প্রথম অবস্থায় আপনার ওয়েব সাইট না থাকলেও চলবে। কিন্তু সোস্যাল মিডিয়া অবশ্যই থাকতে হবে। অনেক সোস্যাল মিডিয়া আছে, যেমনঃ ফেসবুক, টুইটার, ইন্সট্রাগ্রাম, ইউটিউব সহ আরো অনেক। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ফেসবুক আর ইউটিউব সব থেকে বেশি মানুষ ব্যবহার করে। তাই আপনার একটা ফেসবুক পেজ আর ইউটিউব চ্যানেল থাকতে হবে। আপনার ই-কমার্সের নামে একটা পেজ করে ফেলুন আর প্রোডাক্টের ছবি সুন্দরভাবে পেজে পোস্ট করুন। কম সময়ের ভিডিও বানিয়ে পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে পোস্ট করুন। আপনার টার্গেটেড এলাকা, কোন বয়সের কাস্টমার চাচ্ছেন, ছেলে নাকি মেয়ে কাস্টমার(আপনার প্রোডাক্টের উপর ভিত্তি করে) এর কাছে আপনার পেজ পৌছানোর জন্য পেজ বুস্ট করতে পারেন। শুধু বুস্ট করলেই হবে না। কোয়ালটি সম্পন্ন বুস্ট করতে হবে। এর জন্য সুন্দর ব্যানার ডিজাইন করতে হবে। সুন্দর কন্টেন্ট লিখতে হবে, আবার টার্গেটেড অডিয়ান্স নিয়ে রিসার্স করতে হবে। ব্যবসার পাশাপাশি আবার এসব নিয়ে কাজ করা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে, তাই এসবের দায়িত্ব ভাল কোন সার্ভিস প্রোভাইডারকে দিয়ে আপনার অন্যান্য কাজ গুলো সুন্দরভাবে করতে পারবেন। এক্ষেত্রে ইয়াপ্পোবিডি এর সার্ভিস নিতে পারেন। সাশ্রয়ী মুল্যে কোয়ালিটি সম্পন্ন সার্ভিস।

এবার গুগল র‍্যাঙ্কের পালা। তবে এর জন্য একটা ওয়েবসাইট অবশ্যই থাকতে হবে। কেউ যদি গুগল সার্চ করে “Best ecommerce in bd” বা প্রোডাক্ট ক্যাটেগরি অনুযায়ী যদি সার্চ করে যেমন- “best t-shirt seller”, “best mobile accessories”. সেই সার্চ রেজাল্টে গুগল যেন আপনার ওয়েবসাইট সবার প্রথমে দেখায় সেই ব্যবস্থা করা। এর জন্য যেটা করতে হবে সেটা হল সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন(SEO). এটা অবশ্যই আপনার কাজ না। এর জন্য SEO এক্সপার্ট বা SEO সার্ভিস সেল করে এমন কোন প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিতে হবে।

টিম-বিল্ড করাঃ

ব্যবসার প্রথম দিকে যখন আপনার কাস্টমার অনেক কম তখন পর্যন্ত আপনি একাই সব কাজ করতে পারেন। কিন্তু ধীরে ধীরে কাস্টমার বাড়ার সাথে সাথে আপনার কাজও অনেক বেড়ে যাবে। আর তখন সব কাজ একাই করতে যাবেন না। ভাল একটা টিম বিল্ড করুন। আপনি একাই যতদুর যেতে পারবেন তার থেকে শতগুন আগে যেতে পারবেন টিম কে সাথে নিয়ে। এজন্য বিশ্বস্ত টিম মেম্বার খুজে বের করে তাদের প্রশিক্ষন দিয়ে আপনার সহযোদ্ধা বানিয়ে নিন।

এই ছিল ই-কমার্স শুরুর আদ্যোপান্ত। মনে রাখবেন শুধু শুরুর প্রস্তুতি এটা। আর এগুলাই যে সবকিছু তাও না, এটা মোটামুটি একটা শুরুর ধাপ। এরপর আপনাকে আরো অনেক কিছু শিখতে হবে জানতে হবে। পরিবেশ-পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষ এসব থেকে আরো অনেক কিছু আপনাকে শিখতে, জানতে হবে। আর এগুলা কখনো বই পড়ে বা কোথাও কোর্স করে শেখা যায় না, এগুলা অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকেই শিখতে হয়। ধৈর্য্য নিয়ে যদি লড়ায়ে টিকে থাকতে পারেন তাহলে এগুলো এমনিতেই শিখে যাবেন।

আর আপনার অনলাইন ব্যবসার যেকোন কনসালটেসি এবং সেবা প্রদানের জন্য ইয়াপ্পোবিডি তো আছেই। আমাদের কাছ থেকে আপনি আপনার সাধ্যমত বাজেটেই আপনাার প্রথম ই-কমার্স ওয়েবসাইটি তৈরি করে নিতে পারেন। অথবা আপনার যেকোন ব্যবসায়িক আলোচনার জন্য আমারে সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

Facebook Comment